হলিউডের যেসব চিত্রনাট্যকার নিজেদের চলচ্চিত্রকে ঘৃণা করতেন

একটি চলচ্চিত্রকে ভালো মানের কাজে পরিণত করতে যেমন প্রয়োজন একজন দক্ষ পরিচালক এবং অভিনয়শিল্পী, তার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে  বেশি ভূমিকা রাখে একটি ভালো গল্প অথবা চিত্রনাট্য। তাই যে কোন চলচ্চিত্রের সফলতায় একজন চিত্রনাট্যকারের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়।

তবে একজন চিত্রনাট্যকার নিজের সকল কাজের ভক্ত নাও হতে পারেন। চিত্রনাট্য থেকে সিনেমাতে পরিবর্তিত হবার সময় আসে বেশ কিছু পরিবর্তন,আসতে পারে অনেক রকম ভুলত্রুটি। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এরকম হতাশ চিত্রনাট্যকারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আশ্চর্যজনক হলেও এ তালিকায় রয়েছে হলিউডের বেশ কয়েকটি হেভিওয়েট নাম। আজকে আপনাদের সামনে তুলে ধরব হলিউডের সে সকল চিত্রনাট্যকারের কথা, যারা নিজেরাই নিজেদের চিত্রনাট্য অবলম্বনে বানানো কোনো চলচ্চিত্রকে ঘৃণা করেন।

কোয়েন্টিন টারান্টিনোঃ ন্যাচারাল বর্ন কিলারস (১৯৯৪)

হলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং অভিনেতা কোয়েন্টিন টারান্টিনো নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে ওলিভার স্টোনের কাছে ন্যাচারাল বর্ন কিলারের চিত্রনাট্য বিক্রি করে দেন। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র রিজারভয়ের ডগসের (Reservoir Dogs) ফান্ডিং তোলার জন্য তিনি এটি বিক্রি করেছিলেন৷ এ মুভিটি ১৯৯২ সালে মুক্তি পায়। তারও দুই বছর পর ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় ন্যাচরাল বর্ন কিলারস

কোয়েন্টিন টারান্টিনো; Source : pinterest.com

যদিও এ চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে ভালোই সাফল্য পেয়েছিল, কিন্তু টারান্টিনো মুভিটি নিয়ে বেশ নাখোশ ছিলেন। তার লেখা মূল চিত্রনাট্য থেকে মুভিটির পার্থক্য অনেক বেশি থাকায় তিনি অসন্তুষ্ট হন। ২০১৩ সালে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার ভক্তদের অনুরোধ করেন, মুভিটিকে তার কাজ হিসেবে বিবেচনা না করতে। এ মুভিটির জন্য টারান্টিনোকে বেশ আইনি ঝামেলাও পোহাতে হয়েছিল। মুভিটি মুক্তি পাওয়ার অনেক বছর পর একবার তিনি তার লেখা চিত্রনাট্যটি বই আকারে প্রকাশ করার চেষ্টা করলে মুভিটির প্রযোজকেরা তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়। শেষ পর্যন্ত আদালত টারান্টিনোর পক্ষে রায় দিলে সে যাত্রা তিনি নিস্তার পান।

পল রুডনিকঃ সিস্টার আ্যাক্ট (১৯৯২)

আশির দশকে ঔপন্যাসিক পল রুডনিক শখের বশেই চিত্রনাট্য লেখার দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়েন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি টাচস্টোন স্টুডিওর প্রযোজনায় সিস্টার আ্যাক্ট নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করেন।

পল রুডনিক ; Source : goodreads.com

কিন্তু প্রযোজকদের অনুরোধে চিত্রনাট্য বারবার পরিবর্তন আনতে গিয়ে তিনি পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি টাচস্টোন স্টুডিওকে অনুরোধ করেন, মুভির ক্রেডিটে তার নাম উল্লেখ না করতে। কিন্তু প্রযোজকরা তাকে মুক্তির পূর্বেই মুভিটি একবার দেখে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করে। তবে তিনি সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন এবং নিজ নামের পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত জোসেফ হাওয়ার্ড ছদ্মনামটি ব্যবহার করেন।

কার্ট সাটারঃ পানিশার : ওয়ার জোন (২০০৮)

বর্তমানে ছোট পর্দায় মার্ভেল সুপারহিরো পানিশার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও পূর্বে পরিস্থিতি বেশ ভিন্ন ছিল ৷ ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং থমাস জেন ও জন ট্রাভোল্টা অভিনীত পানিশার মুভিটি মোটামুটি সফল হবার পরে প্রযোজকরা এর সিক্যুয়েল বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।

কার্ট সাটার; Source : youtube.com

২০০৭ সালে সান্স অব এনার্কি  টিভি সিরিজের জনক কার্ট সাটারকে দায়িত্ব দেওয়া হয় পানিশার ২ এর চিত্রনাট্য লেখার জন্য। সাটার চেয়েছিলেন কমিকস বইয়ের সুপারহিরো পানিশারের পরিবর্তে পানিশারকে ঘিরে একটি বাস্তবধর্মী মুভি বানাতে। কিন্তু মার্ভেল স্টুডিও চেয়েছিল মুভিটি কমিকসকেন্দ্রিক হোক, তাই তারা চিত্রনাট্যে প্রচুর পরিবর্তন আনে। শেষ পর্যন্ত মুভিটি এমন এক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায় যা সাটারের নিজস্ব লেখনি থেকে অনেকটা আলাদা ছিল। দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, এ মুভিটির সাথে নিজের নাম জড়াবেন না। কারণ মুভিটিকে তিনি নিজের লেখা বলে তিনি মনে করেন না।

ব্রেট ইস্টন এলিসঃ দ্য ইনফরমার্স (২০০৮)

ব্রেট ইস্টন এলিস রচিত উপন্যাস দ্য ইনফরমার্স  অবলম্বনে একই নামে এ মুভিটি তৈরি করা হয়। মুভিটির চিত্রনাট্য তৈরিতেও ইস্টন সহযোগিতা করেন। তবে তৈরি হবার পর ইস্টন মুভিটির ব্যাপারে অনেকটা বিতৃষ্ণা পোষণ করেন। কারণ তার মুভিটির মূলভাবই অনেকখানি বদলে গিয়েছিল।

ব্রেট ইস্টন এলিস; Source : hollywoodreporter.com

তিনি চেয়েছিলেন, মুভিটি ডার্ক হিউমার ক্যাটাগরির হোক। কিন্তু এর বদলে তা অনেকটা মেলোড্রামাটিক ঘরানার মুভি হয়ে গিয়েছে ৷ এজন্য তিনি সম্পূর্ণভাবে ছবিটির অস্ট্রিলিয়ান পরিচালক গ্রেগর জর্ডানকে দোষারোপ করেন। তার মতে, জর্ডান কমেডি ধাঁচের একটি গল্পকে অস্ট্রেলিয়ান সোপ অপেরায় পরিণত করেছেন।

জে.ডি শাপিরোঃ ব্যাটেলফিল্ড আর্থ (২০০০)

১৯৯৭ সালে অভিনেতা এবং প্রযোজক জন ট্রাভোল্টা চিত্রনাট্যকার জে.ডি শাপিরোকে দায়িত্ব দেন সায়োন্টলোজির উদ্ভাবক এল. রন হাবার্ডের উপন্যাস ‘ব্যাটেলফিল্ড আর্থ : এ সাগা অব দ্য ইয়ার ৩০০০’ অবলম্বনে একটি মুভি বানানোর জন্য। কিন্তু শাপিরো মূল গল্প থেকে অনেক বেশি হিংস্রতাসম্পন্ন একটি চিত্রনাট্য লেখেন ৷ নির্মাতাদের অনুরোধ করার পরেও তিনি স্ক্রিপ্টে পরিবর্তন আনতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে এ প্রজেক্ট থেকে ছাঁটাই করা হয়।

জে.ডি শাপিরো ; Source : pinterest.com

তবে নতুন চিত্রনাট্যকার নিয়োগের পরেও শাপিরোর লেখার অধিকাংশ অংশ মুভিটিতে জায়গা পায়। কিন্তু এর পরেও তাদের শেষ রক্ষা হয় নি। ব্যাটেলফিল্ড আর্থ  ২০০০ সালের সবচেয়ে নিম্নমানের এবং ফ্লপ মুভি হিসেবে কুখ্যাতি পায়। এ কারণে এ মুভির সাথে নিজের সম্পৃক্ততা থাকায় শাপিরো মূল উপন্যাসটির ভক্তদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি দেন এবং মুভিটির ব্যর্থতার জন্য তাদের কাছে ক্ষমা চান। তবে ব্যর্থতার দায়ভার নিলেও তিনি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সহনশীল ছিলেন৷ এমনকি মুভিটি বছরের সবচেয়ে বাজে চিত্রনাট্যের জন্য গোল্ডেন র‍্যাস্পবেরি অ্যাওয়ার্ড পেলে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে তা গ্রহণ করেন।

ফিচারড ইমেজঃ Pictaram

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.